রাইফেল এর আদিযুগ বলতে উনবিংশ শতাব্দীতে শুরু হয়েছিলো। এর আগে বা ঐ সময় বা এর পরে বিভিন্ন দেশে যেসব ব্যবহার হতো তা আসলে রাইফেল ছিলো না, তাকে মাস্কেট বলা হতো। তবে আজ মাস্কেট নয়, আজ আমি ইতিহাসে কিছু লিজেন্ডারি রাইফেল ও আমার কিছু প্রিয় রাইফেল নিয়ে আলোচনা করবো।

আমি আশা করবো আপনাদের মতামতগুলো ও কমেন্টে জানাবেন।

 

 

Dreyse Needle Gun

 

 

এটাকেই বলা হয় প্রথম বোল্ট একশন রাইফেল। সার্ভিস এর দিক দিয়ে নয় বরং এটা তৈরির দিক দিয়ে এটা আসলে লিজেন্ডারি রাইফেল। এই রাইফেল আসার পর অস্ত্রের জগতে এক বিপ্লব তৈরি হয়। যখন সৈনিকরা দাড়িয়ে মাস্কেট দিয়ে ফায়ার করতো তখন এটা দিয়ে শুয়ে বা যেকোন পজিশনে ফায়ার করা যেত যাকে বলা যায় খেল খতম। ১৮৪১ সালে জার্মান (প্রোসিয়া) মিলিটারীতে প্রথম সার্ভিসে আসে। এর ওজন সাড়ে চার কেজির কিছু বেশি, লম্বায় পাচঁ ফুটের কাছাকছি। ক্যালিভার পেপার কার্তুজ। রেট অফ ফায়ার মিনিটে ৬ রাউন্ড আর রেঞ্জ ৬৫০ গজ।

 

Lee-Enfield Rifle

 

 

এই রাইফেলটা হলো ব্রিটিশদের অহংকার বা গর্ব। আধুনিক রাইফেলের কথা বললে এই রাইফেলকে ফাদার অফ অল রাইফেল বলা চলে। এটি এক লিজেন্ডারি রাইফেল। ১৯০৪ সালে এই রাইফেল সার্ভিসে আসে এবং এখনো সার্ভিসে দিয়ে যাচ্ছে। ব্রিটেন ছাড়াও বিভিন্ন দেশে এই রাইফেল টি ব্যবহার করা হতো।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এর সময় এটাই ছিলো সেরা রাইফেল, ২য় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশরা এই রাইফেল গর্বের সাথে ব্যবহার করে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে এই রাইফেল সবচেয়ে বেশি দেখা যেতো।

এখনো বাংলাদেশ পুলিশ ও বাংলাদেশ আনসার এই রাইফেল ব্যবহার করে। এর ওজন চার কেজির কিছু বেশি, ক্যালিভার ৩০৩ (থ্রি নট থ্রি), রেট অফ ফায়ার ২০-৩০ রাউন্ট প্রতি মিনিটে, ইফেক্টিভ রেঞ্জ ৫৫০ গজ।

এর রিলাইবেলিটির জন্য সৈনিকদের কাছে খুবই জনপ্রিয় ছিলো। আর এটি বিশাল পরিমাণে তৈরি করেছিলো (প্রায় ২ কোটির মত)। ব্যাক্তিগত ভাবে এটি আমার খুবই পছন্দের রাইফেল।

 

Karabiner 98k 

এই রাইফেল নাৎসি জার্মানির তৈরি বোল্ট একশন রাইফেল। ১৯৩৫ থেকে এখনো এটি সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছে। ক্যালিভার ৭.৯২, ওজন চার কেজির মতো, ইফেক্টিভ রেঞ্জ ৫৫০ গজ।

এই রাইফেল স্নাইপার হিসেবেও ব্যবহার হতো। প্রায় দেড় কোটির মত বানানো হয় এই রাইফেল। এর ম্যাগজিনে ৫ রাউন্ড গুলি ধরে যার জন্য এটা লি-এনফিল্ড এর কাছে মার খেয়ে যাবে। তবে এটিও আমার পছন্দের একটি রাইফেল।

 

M1 Garand

প্রথম সেমিঅটোমেটিক বা গ্যাস অপারেটর রাইফেল ছিলো ফ্রান্সের ফসিল। কিন্তু সেমিঅটোমেটিক রাইফেলের ক্ষেত্রে সেরা হচ্ছে এমওয়ান গ্রান্ড। যদি আমেরিকানদের প্রিয় রাইফেল এর একটা লিস্ট দেয়া হয় তবে প্রায় ৯০% মানুষের লিস্টে এটা থাকবে। এখনো আমেরিকান আর্মি, মেরিনরা তাদের প্যারেড বা গার্ড অফ অর্নার দেয়ার সময় এটা দিয়ে ফায়ার করে।

২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকান জেনারেল জর্জ এস প্যাটন বলেছেন “In my opinion, the M1 rifle is the greatest battle implement ever devised.”। এর এক্যুরেসি ও রিলায়েবিলিটি নিয়ে কোন কথা হবে না। ওজন চার কেজির কিছু বেশি, ক্যালিভার ৩০-০৬ (৭.৬২) মিলি, ইফেক্টিভ রেঞ্জ ৫০০ গজ।

২য় বিশ্বযুদ্ধের পর কোরিয়াতে ও ভিয়েতনামে এটা ব্যবহার করা হয়।

 

M-14

এমওয়ান গ্রান্ড এর পরিবর্তে ১৯৫৯ সালে এটি ইউএস মিলিটারীতে সার্ভিসে আসে। এর এক্যুরেসি ও রিলায়েবিলিটির জন্য ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় সৈনিকদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় রাইফেল ছিলো (এম ১৬ থেকে ও এটি বেশি জনপ্রিয় ছিলো)। ওজন পাঁচ কেজির মত, ক্যালিভার ৭.৬২ মিলিমিটার, ন্যাটো ইফেক্টিভ রেঞ্জ ৮৭৫ গজ, ২০ রাউন্ডের বক্স ম্যাগাজিন। বর্তমানে এটা স্নাইপার হিসেবে ব্যবহার হয়।

 

Sturmgewehr 44

জার্মানরা যেমন বোল্ট একশন রাইফেলের জনক, ঠিক তেমন ভাবে এসল্ট রাইফেলের জনকও তারা।

স্ট্রোমগ্রেভিয়ার ৪৪ হলো পৃথিবীর প্রথম এসল্ট রাইফেল। এই রাইফেল অস্ত্রের জগতে আবার আরেক বিপ্লব ঘটায় যা একশো বছর আগে জার্মানরা ঘটিয়েছিলো বোল্ট একশন রাইফেল এর মাধ্যমে। এটি সার্ভিসে আসে ১৯৪৩ সালে এবং এখনো সিরিয়ান যুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে।

ওজন সাড়ে চার কেজি, অটো এবং সেমি অটোমেটিক, ক্যালিভার ৭.৯২, রেট অফ ফায়ার ৫৫০ রাউন্ড পার মিনিট, রেঞ্জ ৬০০ গজ, ম্যাগাজিন ৩০ রাউন্ডের বক্স।

 

AK-47 (AKM, Type-56)

আমার হয়তো এর সম্পর্কে কিছু বলা লাগবে না। কারন বাচ্চা থেকে বুড়ো কেউ যদি রাইফেল আর শর্ট গানের মধ্যে পার্থক্যও না বুঝে কিন্তু একে-৪৭ কোনটা তা তারা ঠিকই জানে। অনেকে আবার রাইফেল বলতে একে-৪৭ কেই চিনে। রাশিয়ার গর্ব বা অহংকার (রাশিয়া মানে একে ৪৭ আর একে ৪৭ মানে রাশিয়া)। পৃথিবীর বেশির ভাগ মিলিটারী থেকে শুরু করে কচি-খোকা, বুড়ো দাদু, গুন্ডা বদমাইশ, জঙ্গী, জল-দস্যু সবাই এই রাইফেলটা চায়।

সন্ত্রাসী মহলে এর জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি (Ultimate bad-guy gun)। এর রিলায়েবিলিটি ও ফায়ারিং নিয়ে কোন কথা হবে না। এর সম্পর্কে আমার বিস্তারিত বলা লাগবে না । সাবাই জানেই এটি কি জিনিশ !

একে ৪৭ তৈরি হয়েছে ৭৫ মিলিয়ন আর এর বাচ্চাকাচ্চা (কপি ভার্সন) তৈরি হয়েছে ১০০ মিলিয়নের উপর এবং তা এখনো বানানো হচ্ছে। পাকিরা ৭১ এ টাইপ ৫৬ ব্যবহার করতো। বিডি ০৮ (একে ফ্যামেলি) আসার আগে বাংলাদেশ আর্মি ও টাইপ ৫৬ ব্যবহার করতো। একেএম মডেল ব্যক্তিগতভাবে আমার খুব প্রিয়।

 

M-16

এটি আমেরিকান প্রথম এসল্ট রাইফেল (সার্ভিস ১৯৬৪-চলছে)। একে-৪৭ এর একমাত্র রাইভাল, দেখতে খুবই সুন্দর (কিন্তু আমার মতে Piece of Garbage, সরি ফর দ্যাট)।

ওজন তিন কেজি থেকে কিছু কম, ক্যালিভার ৫.৫৬ মিলিমিটার, রেট অফ ফায়ার ৯৫০ রাউন্ড পার মিনিট, ইফেক্টিভ রেঞ্জ ৮০০ গজ, ২০ রাউন্ডের বক্স ম্যাগাজিন। এর এক্যুরেসি ও রেঞ্জ একে-৪৭ থেকে অনেক ভাল কিন্তু এর প্রথম সমস্যা হচ্ছে জ্যামিং তাই এটা আমার পছন্দের রাইফেল না।

ভিয়েনাম যুদ্ধে এটি জনপ্রিয় ছিলো না, আমেরিকানরা এম ১৪ পছন্দ করতো। এটা বিশ্বের ৮০টার উপর দেশে ব্যবহার হয়, স্পেশাল ফোর্সগুলাতে ব্যবহার হয় (ভাল না হলে তো আর ব্যাবহার হয় না)। বাংলাদেশ ও কিছু পরিমান ব্যবহার করে।

 

G-3

জি-৩ অনেক জনপ্রিয় একটি এসল্ট রাইফেল। এর জন্মস্থান জার্মানিতে (সার্ভিস ১৯৫৯-চলছে)। এর কার্তুজ ৭.৬২ মিলিমিটার, রেট অফ ফায়ার ৫০০-৬০০ রাউন্ড পার মিনিট।

১৯৭০ সালে পাকিরা এর টট কিনে আনে এবং বাংলাদেশের ফ্যাক্টিরিতে তৈরি করে এবং স্বাধীনতার পর আমাদের সরকার বাংলাদেশ আর্মিতে এটা ব্যবহার করে। এর এক্যুরেসি ও রিলায়েবিলিটি ভাল। এই রাইফেলটি আমার প্রিয় একটি রাইফেল।

 

FN FAL



এটা বেলজিয়ামের তৈরি এসল্ট রাইফেল (সার্ভিস ১৯৫৪-চলছে)। ব্রিটিশ আর্মি সহ বিশ্বের প্রায় ৯০ টি দেশে এটি ব্যবহার করে। এর ওজন চার কেজির উপর, ক্যালিভার ৭.৬২ মিলি, রেট অফ ফায়ার ৭০০ রাউন্ড পার মিনিট, ইফেক্টিভ রেঞ্জ ৬০০ গজ। এই রাইফেল ইন্ডিয়ান আর্মির স্ট্যান্ডার্ট রাইফেল ছিলো যা তারা টট (এস এল আর) কিনে এনে বানাতো।

৭১ সালে পাকিদের টাইপ ৫৬ বিরুদ্ধে এটা ব্যবহার করে ইন্ডিয়ান আর্মি। এর পরিবর্তে ইন্ডিয়ান আর্মি একটা Piece of garbage ব্যবহার করে যার নাম ইনসাস(Insas)। যাই হোক ইনসাস এর সার্ভিস শেষ এখন তারা এতদিন পর একে-৪৭ এর কপি বানাবে বলে ঠিক করে।

 

AK-74(Ak 101, Ak 102)

একে-৪৭ এর সীমাবদ্ধতাগুলোর উপর কাজ করে একে-৭৪ বানানো হয়। এর মধ্যে একে-৭৪ এম ভার্সনটা আমার প্রিয়। বর্তমান রাশিয়ান আর্মির স্ট্যার্ন্ডাট রাইফেল এটি। এর ওজন তিন কেজির মতো, রেট অফ ফায়ার ৬০০-৬৫০ পার মিনিট , ক্যালিভার ৫.৪৫ মিলিমিটার, ইফেক্টিভ রেঞ্জ ৪০০ গজ । একে ১০১ এবং একে ১০২ তে ক্যালিভার ভিন্ন আর কিছু আপডেট আনা হয়েছে।

 

IMI Gali
ইজরায়েলকে আমরা যত গালিই দেই না কেন, তারা একটা মাস্টার পিস বানাইছে। এই রাইফেল একে ৪৭ ও এম ১৬ এর উপর গবেষনা করে বানানো হইছে। সার্ভিসে আছে ১৯৭২ সাল থেকে। এর ওজন চার কেজির কিছু কম, ক্যালিভার ৭.৬২ ও ৫.৫৬ মিলি, ইফেক্টিভ রেঞ্জ ৫০০ গজ, রেট অফ ফায়ার ৭৫০ রাউন্ড পার মিনিট।

 

M-4 Carbine

এম ওয়ান গ্রান্ড এর পর আমার সবচেয়ে প্রিয় রাইফেল এটি। M-16 এর সব ফিচারই এখানে আছে কিন্তু এম-১৬ থেকে এটা বেশি লাইটার, রিলায়েবল ও এক্যুরেট। বলা চলে এম ১৬ এর প্রায় সব সমস্যার সমাধান এটাতে। এই রাইফেল দেখতে যেমন প্রেয়সীর মত সুন্দর তেমন ডাইনীর মত ডেডলি, দেখলেই নিজের কাছে রেখে দিতে মন চায় আর কিছু সময় পর পর চুম্মা দিতে মন চায়।

বিশ্বের প্রায় ৭০ টা দেশে অলরেডি ব্যবহার হয়। সার্ভিসে আসে ১৯৯৪ সালে। বাংলাদেশ আর্মির প্যারা কমান্ডো, পুলিশের সোয়াট, নেভির স্পেশাল ফোর্স এটি ব্যবহার করে।

 

বিশাল বড় লিস্ট হয়ে গেল। আরেকদিন বুলপপ রাইফেল সম্পর্কে পোস্ট দিবো। কমেন্টে আপনাদের মতামত জানাবেন।

মূল লেখাঃ সিফাত আদনান ও নিজে সংযোজিত।

Facebook Comments

comments